বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে বাস্তবধর্মী অভিনয়ের উদাহরণ তৈরি করা অভিনেত্রীদের মধ্যে এখন অন্যতম নাম Nazifa Tushi। ‘হাওয়া’ সিনেমার পর এবার নতুন সিনেমা ‘রইদ’ নিয়ে আবারও আলোচনায় এই অভিনেত্রী। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ‘রইদ’ সিনেমার চরিত্রের প্রস্তুতি, শারীরিক পরিবর্তন, মানসিক সংগ্রাম এবং কঠিন শুটিং অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তর কথা বলেছেন তিনি।
তুষির ভাষ্য অনুযায়ী, ‘রইদ’ শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিনয় যাত্রাগুলোর একটি।
‘রইদ’ সিনেমার জন্য ছয় মাসের কঠিন প্রস্তুতি
সাক্ষাৎকারে Nazifa Tushi জানান, সিনেমাটির চরিত্রে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি প্রায় ছয় মাস ধরে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি কোনো ধরনের শ্যাম্পু, সাবান, কন্ডিশনার কিংবা প্রসাধনী ব্যবহার করেননি।
তাঁর ভাষায়, চরিত্রটির বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। কারণ তিনি চেয়েছিলেন তাঁর ত্বক যেন প্রকৃতভাবেই রোদে পুড়ে যায় এবং চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে। নিজের গায়ের রঙ পরিবর্তন করতে তিনি সরিষার তেল মেখে কড়া রোদে বসে থাকতেন।
তুষি বলেন, “শুধুমাত্র পানি ব্যবহার করতাম আমি। কারণ সাবান ব্যবহার করলে ত্বক পরিষ্কার হয়ে যেত এবং চরিত্রের প্রয়োজনীয় রুক্ষতা হারিয়ে ফেলত।” এমনকি চরিত্রের মুখের ক্ষত ও রুক্ষতা ফুটিয়ে তুলতে তিনি পাথরের চুন খেয়ে নিজের জিভ ও মুখ পুড়িয়ে ফেলার মতো দুঃসাহসিক ত্যাগও স্বীকার করেছেন।
সরিষার তেল মেখে রোদে পুড়তেন অভিনেত্রী
সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল সরিষার তেল ব্যবহার নিয়ে তার অভিজ্ঞতা। অভিনেত্রী জানান, নিয়মিত শরীরে সরিষার তেল মেখে রোদে যেতেন তিনি, যাতে দ্রুত ত্বক পুড়ে যায়।
তাঁর মতে, মেকআপ দিয়ে এই ধরনের বাস্তবতা তৈরি করা সম্ভব ছিল না। কারণ শুটিং চলাকালে ঘাম, বৃষ্টি বা দৌড়ঝাঁপে মেকআপ উঠে যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। তাই পর্দায় শতভাগ বাস্তব দেখাতে তিনি নিজের ত্বককেই কালো ও রুক্ষ করে তুলেছিলেন।
এছাড়া স্থানীয় মানুষের মতো দাঁতের টেক্সচার আনতে নিয়মিত পান খেতেন বলেও জানান তুষি। এমনকি চরিত্রের প্রয়োজনে বিশেষ ধরনের চুন ব্যবহার করার মতো কঠিন চর্চাও করেছিলেন তিনি।
স্থানীয় মানুষের মতো জীবনযাপন করেছেন নাজিফা তুষি
‘রইদ’ সিনেমার চরিত্রকে বাস্তব করে তুলতে শুধু লুক নয়, জীবনযাপনেও পরিবর্তন এনেছিলেন নাজিফা তুষি।
তিনি জানান, শুটিং লোকেশনের স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করেছেন, শ্রমিকদের মতো টিলায় মাটি বহন করেছেন, গাছ লাগিয়েছেন এবং বাড়ি নির্মাণের কাজেও অংশ নিয়েছেন।
এমনকি স্থানীয় বাজার থেকে ব্যবহৃত পুরনো কাপড় কিনে পরতেন তিনি, যাতে তাকে কোনোভাবেই শহুরে মেয়ে মনে না হয়।
তার মতে, চরিত্রটিকে আগে নিজেকে বিশ্বাস করতে হয়েছে। কারণ অভিনেতা নিজে বিশ্বাস না করলে দর্শকরাও সেই চরিত্রকে বিশ্বাস করবে না।
‘রইদ’-এ নামহীন এক চরিত্রে অভিনয়
সাক্ষাৎকারে তুষি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ‘রইদ’ সিনেমায় তার চরিত্রটির কোনো নাম নেই। অভিনেত্রীর ভাষায়, এটি তার অভিনয় জীবনের প্রথম এমন চরিত্র, যার কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই। আর এই চরিত্রের মনস্তত্ত্বে প্রবেশ করাটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।
তিনি বলেন, বাইরে থেকে চরিত্রটিকে সহজ মনে হলেও বাস্তবে সেটির মানসিক জগতে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল।
‘হাওয়া’র চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং ‘রইদ’
অনেকেই Hawa সিনেমায় তুষির অভিনয়কে তার ক্যারিয়ারের বড় সাফল্য হিসেবে দেখেন। তবে অভিনেত্রীর মতে, ‘রইদ’ ছিল ‘হাওয়া’র চেয়েও বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।
তিনি বলেন, ‘হাওয়া’ তাঁকে একজন অভিনেত্রী হিসেবে নতুনভাবে পরিচিতি দিলেও ‘রইদ’-এ তাঁকে আরও গভীর ও ভিন্ন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর মতে, এই সিনেমা দেখলে দর্শক পুরো কষ্ট ও প্রস্তুতির ব্যাপারটি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।
মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের সঙ্গে প্রথম কাজ
সাক্ষাৎকারে সহশিল্পী মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের প্রশংসাও করেন নাজিফা তুষি।
তিনি জানান, এর আগে থেকেই মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। ‘রইদ’-এ প্রথমবার একসঙ্গে কাজ করে তিনি দারুণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন বলেও জানান।
তুষির মতে, শুটিংয়ের সময় তাঁরা শুধুমাত্র অভিনয় করেননি, বরং চরিত্রগুলোর জীবন বাস্তবভাবে অনুভব করার চেষ্টা করেছেন।
ফেস্টিভাল জার্নি নিয়েও আশাবাদী অভিনেত্রী
‘রইদ’ সিনেমার সম্ভাব্য ফেস্টিভাল যাত্রা নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নাজিফা তুষি। তিনি বলেন, দেশের দর্শকদের ভালোবাসাই তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দর্শক ও ফেস্টিভাল থেকেও যদি সিনেমাটি প্রশংসা পায়, সেটি পুরো টিমের জন্য বিশেষ অর্জন হবে।
সবশেষে দর্শকদের কাছে দোয়া চেয়ে অভিনেত্রী বলেন, তাঁরা যেন ভালো কাজের মাধ্যমে দর্শকদের নতুন কিছু উপহার দিতে পারেন।



Leave a Reply